গবাদি প্রাণির রোগ বালাই শেষ পর্ব

কিটোসিস (Ketosis)

কিটোসিস দুগ্ধবতী রোমন্থক পশুর কার্বোহাইড্রেপ ও ভোলাটাইল ফ্যাটি এসিডের ত্রুটিপূর্ণ মেটাবলিজমের কারণে সৃষ্ট একটি বিপাকীয় রোগ। আক্রান্ত পশুর কিটোনেমিয়া, কেটোনিউরিয়া, হাইপোপ্লাইসেমিয়া ও যকৃতের গ্লাইকোজেনের অভাব দেখা দেয়। তাছাড়া রক্তে এসিটোনের মাত্রা বৃদ্ধি পায় বলে এ রোগকে এসিটোনেমিয়া ও বলা হয়। এ রোগ হলে ক্ষুধামন্দা দেখা দেয়। দৈহিক ওজন ও দুধ উৎপাদন হ্রাস পায়। সাধারণত বাচ্চা প্রসবের কয়েকদিন হতে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এ রোগ দেখা দেয়। 

কারণঃ

রক্তে গ্লুকোজের অভাব হলে অর্থাৎ অধিক দুধ উৎপাদনশীল গাভীর খাদ্যে কার্বোহাইড্রেটের অভাব হলে কিটোসিস রোগ দেখা দেয়। দুগ্ধবতী গাভীকে অনাহারে রাখলে রক্তে গ্লুকোজের অভাব দেখা দেয় যা কিটোসিস রোগ সৃষ্টি করে। রুমেনের স্বাভাবিক জীবাণু বিশেষ করে প্রোটোজোয়া মারা গেলে এবং সাইলেজ জাতীয় খাদ্য অতিরিক্ত পরিমাণে গাভীকে খাওয়ালে অতিরিক্ত কিটোন বডিজ সৃষ্টির ফলে কিটোসিস রোগ হয়। দেহে কোবাল্ট, ভিটামিন বি ১২ ইত্যাদির কোন ১টির অভাব হলে কিটোসিস হতে পারে।অতিরিক্ত ধকলে এড্রিনো কর্টিকোট্রফিক হরমোনের নিঃসরন বৃদ্ধি পায় যাতে ফ্যাটি এসিড গ্লুকোজ ও কিটোন বডিজ এ রূপান্তরিত হয় ও কিটোসিস রোগ সৃষ্টি করে।যকৃতের অস্বাভাবিক কার্যক্রমে কিটোসিস হতে পারে।

রোগের লক্ষণঃ

কিটোসিস রোগে নিম্নলিখিত লক্ষণগুলি প্রকাশ পায়।

ক্রমশঃ ক্ষুধামন্দা ও দুধ উৎপাদন হ্রাস এ রোগের প্রধান লক্ষণ।আক্রান্ত গাভী প্রথমে শস্যদানা জাতয়ি ও পরে সাইলেজ খাওযা বন্ধ করে য়ে তবে খড় খেতে থাকে।খাদ্য গ্রহণে অনীহা দেখা দেয়, স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়ে ও পশু আবসাদগ্রস্থ হয়ে পড়ে।আক্রান্ত গাভীর শ্বাস-প্রশ্বাস, দুধ ও বাসস্থানের সর্বত্র এসিটোনের মিষ্টি গন্ধ পাওয়া যায়।লালাঝরা, অস্বাভাবিক চর্বন ও সবকিছু চাটা ইত্যাদি লক্ষণ প্রকাশ পায়।কাঁধ ও মাধ্যভাগের মাংশ পেশীর কাঁপুনি দেখা দেয় এবং গাভী ঠিকমতো সুস্থিত হতে পারে না।স্নায়বিক অতিবেদন, কাঁপুনি ও খিচুনী দেখা যায়।

চিকিৎসাঃ

1) গ্লুকোজ বা ডেক্সট্রোজ ৫০% নর্মাল স্যালাইনে সলুশন বানিয়ে ৫০০ মিঃলিঃ শিরায় ইনজেকশন করলে দ্রুত সুফল পাওয়া যায়। পাশাপাশি প্রপাইলিন গ্লাইকোল বা প্রিসারিন ১২৫-২৫০ গ্রাম সমপরিমাণ পানির সাথে মিশিয়ে প্রথমে দিনে ২ বার ২ দিন ও পরে দিনে ১ বার ২দিন খাওয়াতে হবে। সহযোগী চিকিৎসা হিসাবে বি ৫০ ভেট ইনজেকশন প্রয়োগ করতে হয়।

2) ১০০০ মিঃগ্রাঃ হাইড্রোকর্টিসোন বা ১০০ মিঃ গ্রাঃ প্রেডনিসোলন বা ১০ মিঃ গ্রাঃ ডেক্সোমেথাসোন বা ২ মিঃ গ্রাঃ বিটামিথাসোন বা ২ মিঃ গ্রাঃ ফ্লুমেথাসোন মাংশ পেশীতে ইনজেকশন প্রয়োগ করতে হয়। আক্রান্ত গাভীকে লালিগুড় খেতে দেওয়া উচিৎ নয়।

দুগ্ধজ্বর (Milk Fever/Parturient Perosis)

দুগ্ধজ্বর স্ত্রী পশুর প্রসবের সাথে সম্পর্কিত একটি বিপাকীয় বিজ্বর রোগ। রক্তের ক্যালসিযামের মাত্রা কমে যাওয়া সাধারণ পেশীর দুর্বলতা, সংবহনে অকৃতিকার্যকতা ও চেতনা হ্রাস এ রোগের বৈশিষ্ট। রোগটিকে দুধজ্বর বলা হলেও আসলে কোন জ্বর থাকে না বরং তাপমাত্রা নিম্নগামী থাকে। 

রোগের কারণঃ প্রধানত রক্তে আয়োনাইজড ক্যালসিয়ামের মাত্রা হ্রাস পাওয়ার ফলে দুগ্ধজ্বর হয়। এর কারণগুলি নিম্নরূপঃ

1) গাভীর পরিপাকতন্ত ও অস্থি থেকে রক্তে শোষিত ক্যালসিয়ামের পরিমাণ ফিটাস ও কলষ্ট্রামের চাহিদার পরিমাণ থেকে অধিক কম হলে এ রোগ হয়।

2) খাদ্যে যথাযথ ক্যালসিয়ামের অভাব, ক্ষুদ্রান্ত্রে অদ্রবণীয় ক্যালসিয়াম অক্সালেট লবণ সৃষ্টি, রক্তে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের স্বাভাবিক অনুপাতের (২, ৩: ১) এর ব্যাঘাত, ভিটামিন ডি এর অভাব ও অন্ত্রে প্রদাহের কারণে গর্ভাবস্থা ও কলষ্ট্রাম পিরিয়েডে গাভীর পরিপাকতন্ত্রে সুষ্ঠুভাবে ক্যালসিয়াম শোষিত হয়না। ফলে দুগ্ধজ্বর রোগ সৃষ্টি হয়।

3) অস্থির সঞ্চিত ক্যালসিযাম দ্রুত ও পর্যাপ্ত হারে বের না হওয়ার কারণে রক্তে ক্যালসিয়ামের স্বাভাবিক মাত্রা বজায় থাকে না। ফলে রোগ সৃষ্টি হয়।

রোগের লক্ষণঃ

আক্রান্ত পশুতে প্রথমে ক্ষুধামন্দা ও পরবর্তীতে অস্থির ও উত্তেজিত ভাব লক্ষ্য করা যায়।পশু নড়াচড়া করতে পায় না, বিশেষ করে পিছনের পায়ের জোর কমে যাওয়ায় চলনে অসামঞ্জস্যতা দেখা দেয়। একপর্যায়ে গাভী শুয়ে পড়ে।দেহের তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকে বা খুব সামান্য জ্বর দেখা যায়।আক্রান্ত পশু অবসাদ গ্রস্থ ভাবে দেহের একপাশে মাথা গুজে শুয়ে থাকে।দেহের তাপমাত্রা ৯৭ ডিগ্রি ফাঃ পর্যন্ত হ্রাস পায়, হৃদস্পন্দনের গভীরতা হ্রাস পায়,নাড়ীর গতি বেড়ে যায়, শ্বাস-প্রশ্বাস ধীর-গভীর ও অনিয়মিত হয়, চোখের তারা প্রসারিত হয় এবং চোখ শুস্ক ও স্থির দৃষ্টি দেখায়।সঠিক সময়ে চিকিৎসা না হলে একপর্যায়ে গাভী অজ্ঞান হয়ে পড়ে, রুমেনের স্পন্দন বন্ধ হয়ে যায়, নাড়ী পাওয়া যায় না, হৃদস্পন্দন অস্পষ্ট হয়ে পড়ে এবং ১২-২৪ ঘন্টার মধ্যে গাভী মারা যায়।প্রসবের পূর্বে এ রোগ হলে বাচ্চা হওয়া বন্ধ হয়ে যায় এবং বাচ্চা জরায়ুর মধ্যে মারা যায়।

প্রতিরোধ ব্যবস্থাঃ গর্ভাবস্থায় শেষ ৫ সপ্তাহ অপ্লমাত্রার কালসিয়াম যুক্ত খাদ্য বা এসিড প্রকৃতির খাদ্য প্রদান করা উচিত। এসমযকালে খাদ্যের সাথে পরিমাণ মতো Calcium Powder (ক্যাল-পি) পাউডার পানির সাথে মিশিয়ে দুই বেলা খাওয়াতে হবে।গভাবস্থায় Vitamin-ADE খাওয়ালে ভাল ফল পাওয়া যায়।পশু যাতে কাত হয়ে না শোয়, সেদিকে লদ্য রাখতে হবে কারণ একপাশে ভর করে শুয়ে থাকলে নিউমোনিয়া হতে পারে।

চিকিৎসাঃ 
শিরার মাধ্যমে ক্যালসিয়াম বোরোগ্লকোনেট প্রয়োগ করতে হবে।

পেট ফাঁপা (Tympany / Bloat )

রোমন্থক পশুর পেটে অতিরিক্ত গ্যাস জমে পেট ফাঁপা বা টিমপ্যানি রোগ সৃষ্টি হয়। এর কারণে সষ্ট বদহজম রোগকে পেট ফাঁপা জনিত অর্জীর্ণতা রোগ বলে। সাধারণত পেটে শুধু মুক্ত গ্যাস জমা হলে তাকে টিমপানি এবং ফেনাযুক্ত গ্যাস বুদবুদ আকারে পেটে জমা হলে তাকে ব্লোট বলে। 

রোগের কারণঃ 
প্রধানত খাদ্যের কারণেই টিমপানি হয়। যেমন বংশগত কারণে বা খাদ্যনালীর স্বাভাবিক কার্যক্রম বাঁধাগ্রস্থ হলে, রুমেনের গতিশীলতা হ্রাস পেলে পশুর দেহের অভ্যন্তরে উৎপন্ন গ্যাসের পরিমাণ সঠিক পরিমাণে বের হতে না থাকলে টিমপ্যানি রোগ হয়। আবার অতিরিক্ত লিগুমিনাস ঘাস (যেমন বারসীম, মটর, খেসারী প্রভৃতি) সবুজ সরস ঘাস কার্বোহাইড্রেট যুক্ত খাদ্য খেলে ব্লোট রোগ সৃষ্টি হয়। চারনভূমিতে অধিক ইউরিয়া সার প্রয়োগ, খাদ্যে অতিরিক্ত মাত্রায় ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও নাইট্রোজেন প্রদান করলে এ রোগ সৃষ্টি হয়। 

রোগের লক্ষণঃ

হঠাৎ করে পেট ফুলে যায় যা উর্ধ্ব রাম পার্শ্বে স্পষ্ট বুঝা যায়।আক্রান্ত পশু অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে এবং বার বার মাটিতে শুয়ে পড়ে এবং উঠে।শ্বাসকষ্ট হয় এবং পশু মুখ হা করে শ্বাস নেয়, জিহবা বেরিয়ে যায়, লালাক্ষরণ ও মাথা সামনের দিকে লম্বা করে রাখে।পশুকে দুর্বল ও নিস্তেজ দেখায়, খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করেদেয় এবং প্রস্রাব-পায়খানাও বন্ধ হয়ে যায়।জাবর কাটা বন্ধ হয়ে যায়।

চিকিৎসাঃ 
অতিতীব্র প্রকৃতির পেট ফাঁপা রোগে পশু শ্বাস কষ্টে মারা যেতে পারে। এ অবস্থায় পেটের উর্ধ্ব দিকের বাধাপাশে প্যারালাম্বার ফোসার মধ্যেখানে ছিদ্র করে গ্যাস বের করে ততে হয়। অঅঃপর Stomaplex / Bovi C3 Powder প্রতি প্যাকেটের অর্ধেক ঔষধ ৫০০ মিঃ লিঃ পানির সাথে মিশিয়ে দিনে ২ বার খাওয়াতে হবে।

যক্ষা (Tuberculosis)

প্রচলিত নামঃ ক্ষয় রোগ। 

রোগের কারণঃ মাইবোব্যাকটেরিয়াম বভিস নামক এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া গরুর যক্ষা রোগের জন্য দায়ী। যক্ষা একটি জুনোটিক রোগ অর্থাৎ এ রোগের জীবাণু প্রাণী থেকে মানুষ এবং মানুষ থেকে প্রাণীতে সংক্রামিত হয়। 

রোগের লক্ষণঃ

যক্ষা রোগে আক্রান্ত পশুর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। দিন দিন শুকিয়ে যেতে থাকে।আক্রান্ত পশু অনিয়মিতভাবে গ্রহণ করে। নড়াচড়া কমে যায় এবং যথেচ্ছা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।দেহের তাপমাত্রার পরিবর্তন হয়।পশু ভেদে আক্রান্তের স্থানানুযায়ী যক্ষা রোগের লক্ষণ বিভিন্ন হয়। যেমনঃ ফুসফুসে যক্ষা হলে কাশি, পরিপাকতন্ত্রে যক্ষা হলে থেমে থেমে ডায়রিয়া, কোষ্ঠ-কাঠিন্য, ওলানে যক্ষা হলে ওলান ফুলে যায় এবং অবশেষে আঠালো তরল পদার্থ নিঃসৃত হয়।চূড়ান্ত পর্যায়ে শরীর খুব শুকিয়ে যায় এবং পশুর শ্বাস কষ্ট খুব বেশী হয়।গাভীর ওলান আক্রান্ত হলে দুধের রং হলদে-সবুজাভ হয়।এ রোগে আক্রান্ত পশুতে দীর্ঘমেয়াদী উদরাময় হয় এবং অন্ত্রের প্রাচীর পুরু হয়ে ঢেউ তোলা টিনের ন্যায় ভাঁজ ভাঁজ হয়ে যায়।

প্রতিরোধঃ

যক্ষা রোগাক্রান্ত পশু তাৎক্ষনিকভাবে অন্য পশু থেকে আলাদা করতে হবে।গাভীর দৈনন্দিন পরিচর্যা স্বাস্থ্য সম্মত হতে হবে অর্থাৎ খাবার পাত্র, পানির পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে।যক্ষা আক্রান্ত পশুর দুধ বা মাংস মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না বা একই ঘরে আক্রান্ত পশু ও মানুষ বা অন্য কোন প্রাণী বাস করতে পারবে না।আক্রান্ত পশুর দুধ বাছুরকে খাওয়ানো যাবে না।আক্রান্ত পশুর সর্দি, কাশি, রক্ত বা মল যাতে পরিবেশ দূষিত করতে না পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

চিকিৎসাঃ

1) Streptomycin (স্ট্রেপটোমাইসিসন)

2) Penicillin Injection অথবা Gentamycin Injection

3) Ampicillin Injection

আমার এই পোষ্টটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। এর আগের পর্ব গুলো পড়তে চাইলে। এবং  এরকম আরো পোষ্ট পড়তে চাইলে ঘুরে আসুন আমার ব্লগ swarnaliirinsathi.blogspot.com- এ।

অথবা  swarnaliirinsathi.wordpress.com-এ

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

অফুরন্ত ভালবাসা পর্ব-2

ভাই আর বোন

আসছে দেব-রুক্মিনীর নতুন ছবি "কিডন্যাপ"